1. mahfujpanjeree@gmail.com : Mahfuzur-Rahman :
  2. admin@samagrabangla.com : main-admin :
  3. mahmudursir@gmail.com : samagra :

সমগ্র বাংলাদেশ

  • Update Time : শুক্রবার, জুন ১৬, ২০২৩

বাংলাদেশ: পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

সরকারি নাম : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

রাজধানী : ঢাকা।

সরকার ব্যবস্থা: সরকার  সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা; রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

সময় : +৬.০০ ঘণ্টা গ্রীনিচ প্রমাণ সময়।

আন্তর্জাতিক ডায়ালিং কোড : +৮৮০

সাপ্তাহিক ছুটি: শুক্রবার ও শনিবার। কিছু কিছু অফিস শনিবার খোলা থাকে।

ধর্ম: মুসলিম – ৮৬.৬%,  হিন্দু – ১২.১%, বৌদ্ধ – ০.৬% , খ্রিস্টান – ০.৪%, এবং অন্যান্য – ০.৩%.

প্রধান নৃ গোষ্ঠীসমূহ : চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, মনিপুরী, ত্রিপুরা, তনচংগা।

ঐতিহাসিক দিনসমূহ: স্বাধীনতা দিবস: ২৬ মার্চ,  বিজয় দিবস: ১৬ ডিসেম্বর, শহীদ দিবস: ২১ ফেব্রুয়ারি (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও পরিচিত)।

সমগ্র বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা : বাংলাদেশ ২০°৩৪´ উত্তর অক্ষরেখা থেকে ২৬°৩৮´ উত্তর অক্ষরেখার মধ্যে এবং ৮৮°০১´ পূর্ব দ্রাঘিমারেখা থেকে ৯২°৪১´পূর্ব দ্রাঘিমারেখার মধ্যে অবস্থিত। পূর্ব-পশ্চিমে সর্বোচ্চ বিস্তৃতি ৪৪০ কিলোমিটার এবং উত্তর-উত্তরপশ্চিম থেকে দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিস্তৃতি ৭৬০ কিলোমিটার।

বাংলাদেশের আয়তন : বাংলাদেশের আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার। ভূমির আয়তন ১৩৩,৯১০ বর্গকিমি, বাংলাদেশের নদী অঞ্চলের আয়তন ৯,৪০৫ বর্গকিলোমিটার। বনাঞ্চলের আয়তন ২১,৬৫৭ বর্গকিলোমিটার।

বাংলাদেশের সীমা:  পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ; উত্তরে ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়; পূর্বে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম এবং সেই সঙ্গে মায়ানমার; এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। আন্তর্জাতিক স্থলসীমার দৈর্ঘ্য প্রায় ২,৪০০ কিমি; এর মধ্যে ৯২ শতাংশ ভারতের সঙ্গে এবং বাকি ৮ শতাংশ মায়ানমারের সঙ্গে। উপকূলীয় সীমারেখার দৈর্ঘ্য ৪৮৩ কিলোমিটারের অধিক। ভূখন্ডগত সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল (২২.২২ কিমি) এবং অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০.৪০ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত।

সমুদ্র সীমানা : ৫৮০ কিমি. মহীসোপান : মহাদ্বীপীয় মার্জিন বাইরের সীমা অবধি।

প্রশাসনিক একক  বিভাগ: ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট,  রংপুর এবং ময়মনসিংহ। এছাড়াও বর্তমানে আরো ২টি নতুন বিভাগ প্রাস্তাবিত রয়েছে। জেলা ৬৪টি; উপজেলা ৪৯৫থানা ৬৫২ (২০২৩); ইউনিয়ন ৪,৪৯৮ (২০০৮); মৌজা ৫৯,৯৯০; গ্রাম ৮৭,৩৬২; সিটি কর্পোরেশন ১২ (ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (DNCC); ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (DSCC); গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (GCC); নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (NCC); চট্টগ্রাম বিভাগ; চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক); কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (COCC); রাজশাহী বিভাগ; রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (RCC); খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি); সিলেট সিটি কর্পোরেশন (SCC); বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (BCC); রংপুর সিটি কর্পোরেশন (RACC); ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন (MCC)); পৌরসভা ৩৩০ (২০২৩)।

অর্থনীতি: অর্জন : বাংলাদেশ D-8 এর সদস্য। গোল্ডম্যান স্যাস কর্তৃক “Next Eleven Economy of the world” হিসেবে বিবেচিত।

মাথাপিছু আয় : দেশের মাথাপিছু আয় ২৭৬৫ মার্কিন ডলার (২০২২-২৩ অর্থবছরে)
জিডিপি প্রবৃদ্ধি (%) : দেশের জিডি প্রবৃদ্ধির হার মান ৬ আসন সংখ্যা ৩ শতাংশ (২০২২-২৩ অর্থবছরে)
দারিদ্র্যের হার : দেশের দারিদ্র্য হার এখন ১৮.৭%
মানব উন্নয়ন সূচকে অবস্থান : ১২৯ তম
আন্তর্জাতিক অনুদান নির্ভরতা: ২%
প্রধান ফসল : ধান, পাট, চা, গম, আঁখ, ডাল, সরিষা, আলু, সবজি, ইত্যাদি।
প্রধান শিল্প : পোশাকশিল্প (পৃথিবীর ২য় বৃহত্তম শিল্প), পাট (বিশ্বের সর্ববৃহৎ উৎপাদনকারী), চা, সিরামিক, সিমেন্ট, চামড়া, রাসায়নিক দ্রব্য, সার, চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত, চিনি, কাগজ, ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী, ঔষধ, মৎস্য।
প্রধান রপ্তানি : পোশাক (পৃথিবীর ২য় বৃহত্তম শিল্প), হিমায়িত চিংড়ি, চা, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যাদি, পাট ও পাটজাত দ্রব্য (পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রথম), সিরামিক্স, আইটি আউটসোর্সিং, ইত্যাদি।
প্রধান আমদানি : গম, সার, পেট্রোলিয়াম দ্রব্যাদি, তুলা, খাবার তেল, ইত্যাদি।
প্রধান খনিজ সম্পদ : প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, কয়লা, চিনামাটি, কাচ বালি, ইত্যাদি।
মুদ্রা : টাকা (বিডিটি – প্রতীক  ৳)  ১০০০, ৫০০, ২০০, ১০০, ৫০, ২০, ১০, ৫, ২, ও ১ টাকার নোট আর
৫০, ২৫, ১০, ৫, ২৫, ১০, ৫ ও ১ পয়সা ।

প্রধান নদীসমূহ : পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, ব্রম্মপুত্র, কর্ণফুলী, তিস্তা, শীতলক্ষ্যা, রূপসা, মধুমতি, গড়াই, মহানন্দা।

ভুমির ধরন : প্রধানত সমভুমি, পূর্ব ও দক্ষিনপূর্বে পাহাড়ি ভুমি

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি : ভূপ্রকৃতির ভিত্তিতে বাংলাদেশকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ : হিমালয় পর্বত উত্থিত হওয়ার সময় পাহাড়সমূহ সৃষ্টি হয়। এটিকে দুইভাগে বিভক্ত করা হয়।
ক. দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ,
খ. উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ
২. প্লাইস্টোসিনকালের সোপানসমূহ : আনুমানিক ২৫,০০০ বছর পূর্বে প্লাইস্টোসিনকালে এ সোপানসমূহ সৃষ্টি হয়। তিনটি অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত:

ক. বরেন্দ্রভূমি
খ. মধুপুর ও ভাওয়ালের গড়
গ. লালমাই পাহাড়
৩. সাপ্রতিককালের প্লাবন সমভূমি : বাংলাদেশ নদীবিধৌত একটি বিস্তীর্ণ সমভূমি। সাপ্রতিককালের প্লাবন সমভূমির আয়তন প্রায় ১,২৪,২৬৬ বর্গকিলোমিটার।

জলবায়ুর ধরন : উপ ক্রান্তীয় মৌসুমি বায়ু।

বাংলাদেশের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য : বাংলাদেশের জলবায়ু সাধারণত সমভাবাপন্ন। উষ্ণ ও আর্দ্র গ্রীষ্মকাল এবং শুষ্ক শীতকাল বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এদেশের জলবায়ুকে তিনটি ঋতুতে ভাগ করা হয়েছে। যথা :
১. গ্রীষ্মকাল:গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্র ২১° সি – ৩৮° সি (মার্চ – সেপ্টেম্বর) , ২. বর্ষাকাল: বর্ষ কালে গড় বৃষ্টিপাত ১১০০ মিমি. – ৩৪০০ মিমি. (জুন – আগস্ট) ও ৩. শীতকাল: শীতকালে গড় তাপমাত্রা ১১° সি – ২০° সি (অক্টোবর – ফেব্রুয়ারি)।

আর্দ্রতা : সর্বোচ্চ ৯৯% (জুলাই), সর্বনিম্ন ৩৬% (ডিসেম্বর – জানুয়ারি)।

পর্যটন:  প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যে ভরা আমাদের এই বাংলাদেশ। এই দেশে পরিচিত অপরিচিত অনেক পর্যটক-আকর্ষক স্থান আছে। এর মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক মসজিদ এবং মিনার, পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, অরণ্য ইত্যাদি অন্যতম। এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকা বিভিন্ন স্বতন্ত্র্র বৈশিষ্ট্যে বিশেষায়িত ।

পর্যটন আকর্ষণ: ঢাকা, চট্রগ্রাম, কক্সবাজার, কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কুয়াকাটা, বগুড়া, খুলনা, সুন্দারবন, সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর, এবং কুমিল্লা। ‍সিলেটের শ্রীমঙ্গল, যেখানে মাইলের পর মাইল পরিবেশ রয়েছে চা বাগান। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে–ময়নামতি, মহাগড় এবং পাহাড়পুর। রাঙ্গামাট, কপ্তাই এবং কক্সবাজার প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। সুন্দরবনে আছে বন্য প্রাণী এবং পৃথিবী বিখ্যাত মনগ্রোভ ফরেস্ট ।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর পূর্ব অংশে অবস্থিত। বাংলাদেশের উত্তর সীমানা থেকে কিছু দূরে হিমালয় পর্বতমালা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম রাজ্য এবং মায়ানমারের পাহাড়ী এলাকা। অসংখ্য নদ-নদী পরিবেষ্টিত বাংলাদেশ প্রধানত সমতল ভূমি। দেশের উল্লেখযোগ্য নদ-নদী হলো- পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা, মেঘনা ও কর্ণফুলী।

একেকটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও খাদ্যাভ্যাস বিভিন্ন ধরনের। বাংলাদেশ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেশ যার বাস সুন্দরবনে। এছাড়াও এখানে রয়েছে লাল মাটি দিয়ে নির্মিত মন্দির।

বিমানবন্দর: ঢাকা (আন্তর্জাতিক), চট্রগ্রাম (আন্তর্জাতিক), সিলেট (আন্তর্জাতিক), যশোর, রাজশাহী, সৈয়দপুর, বরিশাল, কক্সবাজার।

পরিবহন ব্যবস্থা : সড়ক, আকাশপথ, রেল, নদীপথ।

শিল্প-ভিত্তিক শ্রমিক বণ্টন: কৃষি : ৪৮.৪%, শিল্প : ২৪.৩%, অন্যান্য : ২৭.৩%

ইপিজেড : ঢাকা, উত্তরা, আদমজী, চট্রগ্রাম, কুমিল্লা, ঈশ্বরদী, কর্ণফুলী, এবং মংলা।

ভূমিকম্প : প্রাকৃতিক কারণবশত পৃথিবীর কঠিন ভূত্বকের কোনো কোনো অংশ সময়ে সময়ে ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে। এই কম্পনকে ভূমিকম্প বলে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর না করায়, পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। সারা দেশব্যাপী নানারকম উদ্বেগ, উত্তেজনার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল জাতির জন্য সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা।
২৫ মার্চের গণহত্যা : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাঙালির তথা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা হয়। সে সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র, নিরীহ, স্বাধীনতাকামী সাধারণ জনগণের ওপর হামলা করে এবং নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। পাকিস্তান তাদের এ অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন সার্চ লাইট’।
স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতা দিবস : গ্রেফতার হওয়ার পূর্বমুহূর্তে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে (২৫ মার্চ রাত ১২টার পর) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এজন্যই ২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস।
১৯৭১ এ বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সামরিক বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে প্রাথমিকভাবে পূর্ব প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক তৎপরতা ছাড়াই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার। এ সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথ তলায়। ১৯৭০-৭১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য দ্বারা মুজিবনগর  সরকার গঠন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণি পেশাজীবী মানুষের ভূমিকা : দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল মহান মুক্তিযুদ্ধ। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিপক্ষে কিছু মতদ্বৈধতা বা বিরোধ থাকলেও ২৬ মার্চ থেকেই পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা এদেশের জনগণকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে। স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, নারী, শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিল্পীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ মুক্তির সংগ্রামে শামিল হয়।
স্বাধীনতা অর্জনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবদান : বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবদান অপরিসীম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবর্গ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। নানা অত্যাচার-নিপীড়ন সহ্য করেছেন। রাজনীতিবিদগণ স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জীবনবাজি রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেছেন। আর বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সারা জীবনের কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রাম নির্দেশিত হয়েছে বাঙালির জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে।
মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বজনমত ও বিভিন্ন দেশের ভূমিকা : ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়। পাকিস্তানবাহিনী ও স্বাধীনতাবিরোধী এদেশীয় দোসরদের দ্বারা সংঘটিত লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হয়। বিভিন্ন দেশ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে।
জাতিসংঘের ভূমিকা : বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান যখন বাঙালি নিধনে তৎপর, তখন জাতিসংঘ বলতে গেলে নীরব দর্শকের ভ‚মিকা পালন করে। নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে ‘ভেটো’ ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রের বাইরে জাতিসংঘের নিজস্ব উদ্যোগে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতাও ছিল সীমিত।
সংবিধান প্রণয়ন ১৯৭২ : সংবিধান একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিল। এই দলিল লিখিত বা অলিখিত হতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধান একটি লিখিত দলিল। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের জনগণ এই সংবিধান লাভ করে। মাত্র নয় মাসে সদিচ্ছা, আন্তরিকতা আর জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রæতির প্রতি সৎ থেকে সংক্ষিপ্ততম সময়ে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান প্রণীত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সরকারের নেতৃত্বে।
বৈদেশিক সম্পর্ক : তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্রনীতির ভ‚মিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবীন রাষ্ট্রটির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকের ভ‚মিকায় ছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। তিনি সব সময় স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলেছেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখায় বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হলো, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রæতা নয়।
১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড : ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কময় একটি দিন। ঘাতকরা এই দিন জাতির পিতা ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। বর্বর হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠা খুনিরা ছিল সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য। পর্দার অন্তরালে ছিল সামরিক ও বেসামরিক ষড়যন্ত্রকারীরা।
খোন্দকার মোশতাক : ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায় : ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেন। প্রায় তিন মাসের
মতো ক্ষমতায় ছিলেন মোশতাক। দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনীতিও করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আস্থা ও বিশ্বাসভাজনদের অন্যতম ছিলেন মোশতাক। তিনিই বঙ্গবন্ধুর সাথে জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। তিনি এদেশের ইতিহাসে জন্ম দিয়েছেন কলঙ্কিত অধ্যায়।
জিয়াউর রহমানের শাসনামল : জিয়াউর রহমান তার শাসনকালে নিজ ক্ষমতা সংহতকরণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন। সেনাবাহিনীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পূর্বক তিনি বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে বলপূর্বক ক্ষমতা দখল করে ২৩ এপ্রিল। ১৯৭৭ সালে সামরিক ফরমান জারি করে বাহাত্তরের সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করেন। ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই ‘রাজনৈতিক দলবিধি’ জারি করে ঘরোয়া রাজনীতি চালু করেন। নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে তিনি ক্ষমতাকে গণতান্ত্রিক ধারায় সুসংহত ও বৈধ করার প্রয়াস পান। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি ১৯ দফা নীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বস্তুত এভাবে তিনি বেশ জনপ্রিয়ও হয়ে ওঠেন।
সামরিক অভ্যুত্থান : জেনারেল এরশাদের সরকার : লে: জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করেন। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিলেন রাষ্ট্রপতি।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও এরশাদের পতন : দীর্ঘ নয় বছরের প্রায় পুরো সময়টাই জনগণ জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। ধারাবাহিক আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পাশে পুলিশের গুলিতে ডা: শামসুল আলম খান মিলন নিহত হলে এরশাদবিরোধী আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের রূপ ধারণ করে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ এর কাছে এরশাদ ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন। ছাত্র-জনতার এই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতনের ফলে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।
ভাষা আন্দোলন : ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন। পরবর্তীকালে এই আন্দোলন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম দেয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের প্রথম পদক্ষেপ ছিল এই আন্দোলন।
শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব : ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের পরের বছর থেকে প্রতিবছর ২১ ফেব্রæয়ারি দিনটি বাঙালির শহিদ দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হয়ে আসছে। ২১-এর প্রভাতফেরি ও প্রভাতফেরির গান বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রæয়ারি বাঙালি জাতি রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছিল। বিশ্বের ইতিহাসে অনন্যসাধারণ ঘটনা হিসেবে আমাদের ভাষা ও শহিদ দিবস আজ আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধান : সংবিধান একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে দ্রæত সংবিধান রচনার দাবি ওঠে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর অনিচ্ছায় নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ভারত স্বাধীনতা আইন দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে। বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সংবিধান প্রণীত হলেও তা মাত্র দুই বছর স্থায়ী ছিল। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলে পাকিস্তানে সাংবিধানিক শাসনের অবসান ঘটে।
১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের সামরিক শাসন ও আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র : ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা মালিক ফিরোজ খানের সংসদীয় সরকার উৎখাত করে দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। এর কিছু দিনের মধ্যে ২৭ অক্টোবর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারণ করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এবং শাসন ও রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেন। তিনি এক অদ্ভুত ও নতুন নির্বাচন কাঠামো প্রবর্তন করেন। তার এই নির্বাচনের মূলভিত্তি ছিল ‘মৌলিক গণতন্ত্র’। মৌলিক গণতন্ত্র হচ্ছে এক ধরনের সীমিত গণতন্ত্র। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ জারি করা হয়।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য : ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের লাহোর প্রস্তাব অনুসারে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু লাহোর প্রস্তাবের মূলনীতি অনুযায়ী পূর্ব বাংলা পৃথক রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়নি। দীর্ঘ ২৪ বছর পূর্ব বাংলাকে স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে। এ সময় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক নীতি অনুসরণ করে। এরই প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলায় স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।
৬ দফা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ : পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিল, ৬ দফা দাবি আদায়ের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করা। মূলত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ অবসানের পর পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারের চরম অবহেলা, পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক, শিক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সীমাহীন বৈষম্যের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু সোচ্চার হন। ৬ দফা কর্মসূচি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের চ‚ড়ান্ত প্রকাশ। এটি ছিল বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক বা মুক্তির সনদ।

তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

More News Of This Category