1. mahfujpanjeree@gmail.com : Mahfuzur-Rahman :
  2. admin@samagrabangla.com : main-admin :
  3. mahmudursir@gmail.com : samagra :

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি

  • Update Time : শুক্রবার, জুন ২৩, ২০২৩

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি (Background of Language Movement)

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি:
দ্বিজাতি তত্তে¡র ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাষা, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাসসহ সকল ক্ষেত্রে বিস্তর ব্যবধান ছিল। কিন্তু এত ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে প্রায় একহাজার মাইলের অধিক ব্যবধানে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি অসম রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়। ফলে পাকিস্তান নামক এই নতুন রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী প্রথমেই বাঙালিকে শোষণ করার কৌশল হিসেবে বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হানে। বাঙালি জাতি মাতৃভাষার ওপর
আঘাতের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পূর্বেই উর্দু বনাম বাংলা নিয়ে ভাষা বিতর্ক দেখা দেয়। ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময়ও মুসলিম লীগের অধিবেশনে ভাষা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু তখন এই বিষয়টি ততটা প্রকট আকার ধারণ করেনি। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে দলের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। সেই সময়ে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের বিরোধিতায় তা সফল হয়নি। ১৯৪০ সালে লাহোর
প্রস্তাবের সময় এই বিতর্ক আবার শুরু হয়। এরপর ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান এবং জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উর্দুকে গ্রহণের পক্ষে মত দেন। ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন বাঙালি লেখক, বুদ্ধিজীবী এর প্রতিবাদ করেন এবং বাংলার পক্ষে বক্তব্য দেন।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন: রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে ‘তমদ্দুন মজলিস’ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। তমদ্দুন মজলিস সভা-সমিতি ও লেখনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। স্বাধীনতা লাভের এক মাস পর ৬-৭ সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলার তরুণ-যুবক রাজনৈতিক কর্মীদল তাদের ভবিষ্যত রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য যুব সম্মেলনের মাধ্যমে গঠন করে ‘পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ’। গণতান্ত্রিক যুবলীগের সম্মেলনে দাবি করা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা হতে হবে বাংলা। ১৫ সেপ্টেম্বর এই সংগঠনটি ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাতে কর্ণপাত করেনি। ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। তারা পাকিস্তানের
অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানায়। এছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম বাংলা করার ব্যাপারে চাপ দিতে থাকে। ক্রমে ভাষার প্রশ্ন রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নূরুল হক ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে তমদ্দুন মজলিস ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে। পরবর্তীকালে এ উদ্দেশ্যে আরও কয়েকটি কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে তমদ্দুন মজলিসের গঠিত প্রথম সংগ্রাম পরিষদটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৮ সালের ১ ফেব্রæয়ারি সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনার পর শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান আশ্বাস দেন যে, মানি অর্ডার, ফরম, ডাকটিকিট ও মুদ্রায় ইংরেজি-উর্দুর পাশাপাশি বাংলায় লেখা হবে। কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৮ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া বক্তৃতায় সুকৌশলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ছাত্রদের মধ্যে হতে ‘না’ ‘না’ ধ্বনি সম্বলিত প্রতিবাদ ওঠে।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন:
১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক অধিবেশনে নিম্নপর্যায় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে গ্রহণের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু মুসলিম লীগের সদস্যদের ভোটে তা অগ্রাহ্য হয়। এই সংবাদ ঢাকায় পৌছুলে এদেশের ছাত্র ও শিক্ষিত সমাজ প্রতিবাদমুখর হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে মাতৃভাষার মর্যাদা রাখতে হলে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রয়োজন। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়।
১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ছাত্রসমাজ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। এ পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। শুরু হয়ে যায় একের পর এক আন্দোলনের কর্মসূচি।
নবগঠিত পরিষদ ১১ মার্চ হরতাল আহ্বান করে। হরতাল চলাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুবসহ অনেকে গ্রেফতার হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৩-১৫ মার্চ ঢাকার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্র সমাজের প্রতিবাদের মুখে ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য নেতাদের মুক্তি দেয়া হয়। আন্দোলন তীব্রতর হলে খাজা নাজিমুদ্দীন ১৫ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ৮দফা চুক্তিতে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি, তদন্ত কমিটি গঠন, শিক্ষার মাধ্যম বাংলা ও ব্যবস্থাপক সভায় রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বিষয় উত্থাপনে রাজি হন। কিন্তু ৬ এপ্রিল পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের অধিবেশনে মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ১৫ মার্চের চুক্তি ভঙ্গ করে উর্দুকে পূর্ব
বাংলার সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব করেন। পরিষদের বিরোধী দলের প্রতিবাদের ফলে প্রস্তাবটি পরিষদে উত্থাপিত হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কঠোর নীতি:
পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সাথে সংগ্রাম পরিষদের স্বাক্ষরিত ৮ দফা চুক্তি সাধারণ ছাত্রদের খুশি করতে পারেনি। ফলে আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে অনুষ্ঠিত ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেন ‘উর্দুই এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। উপস্থিত ছাত্ররা ‘না না’ ধ্বনি দিয়ে এর প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলনকারীদের তিনি কঠোর সমালোচনা করেন। জিন্নাহর এ ঘোষণা পূর্ব বাংলার জনমনে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করে। এ সময়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানেই ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ নভেম্বর
প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় এসে বক্তৃতাকালে আবার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। তখনও ছাত্ররা ‘না না’ বলে এর প্রতিবাদ করে।

সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন কর্মসূচি:
১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত সময়কে ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি পর্ব বলা যায়। এই সময়ে আরবি হরফে বাংলা লেখার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে আকরাম খানকে সভাপতি করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ‘পূর্ববাংলা ভাষা কমিটি’ গঠন করে। এই কমিটি গঠনের প্রতিবাদ জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সেপ্টেম্বর মাসে গণপরিষদ কর্তৃক গঠিত মূলনীতি কমিটির সুপারিশে বলা হয়, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’। দেশ জুড়ে এর প্রতিবাদে সভাসমাবেশ চলতে থাকে। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে নিহত হন। তখন তাঁর স্থলে প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দীন।

মূলকথা: ভাষা আন্দোলন বলতে কেবল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিকে বুঝায় না। ভাষা আন্দোলনের একটি দীর্ঘ পটভূমি রয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী, রাজনীতিক ও একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিলেও পূর্ব বাংলার রাজনীতিক, ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী সবাই বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।

তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

More News Of This Category