1. mahfujpanjeree@gmail.com : Mahfuzur-Rahman :
  2. admin@samagrabangla.com : main-admin :

বিজয় দিবস ’২১: প্রেক্ষিত এক অনন্য মাত্রা

  • Update Time : বুধবার, ডিসেম্বর ২২, ২০২১

প্রায় অশীতিপর বৃদ্ধাবস্থায় দাঁড়িয়ে বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী দেখবো বা বিরল বৈশিষ্টে বিভূষিত এই দিনটির তাৎপর্য নির্ভর নিবদ্ধ লেখার সৌভাগ্য হবে, এ কথা স্বপ্নেও ভাবি নি কখনো। একদিকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বিশ্বের নির্যাতিত, শাসিত-শোষিত মানুষের নয়নের মনি, এক অবিসংবাদিত বিপ্লবী নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম বার্ষিকী আর একদিকে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর সাথে সাথে বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী-এ যে কি শিহরণ, কি আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করাও কষ্ঠসাধ্য।

তবু কিছু ভাবতে, কিছু বলতে অথবা কিছু লিখতে না পারলে নিজের কাছেই নিজেকে বড্ড ছোট বলে মতে হয়। ইংরেজী ভাষায় একটি কথা আছে- “ফেইলিওর ইজ দি পিলার অব সাকসেছ” অর্থ্যাৎ পরাজয়ই বিজয়ের সোপান।

বিংশ শতাব্দির ত্রিশের দশক থেকে বাঙালির খন্ড ক্ষুদ্র পরাজয়ের যে সূত্রাপাতি-ক্ষুদিরামের ফাঁসি, তীতুমীরের শাহাদৎবরণ ইত্যাদি ইত্যাদি, তার চুড়ান্ত পরিণতি দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ। তখন থেকেই এ অঞ্চলের বাঙালি তার আত্নপরিচয়ের সন্ধানে আপোষহীন সংগ্রামে অবতীন হয়েছে । বায়ান্নর ভাষা সংগ্রাম, চুয়ান্নর নিবাচন সংগ্রাম, আটান্নর আইয়ুব বিরোধী সংগ্রাম, বাষট্টির শরীফ শিক্ষা-কমিশন বিরোধী সংগ্রাম, ছিষট্টির স্থায়াত্বধিকারের সংগ্রাম, আটষট্টির আগরতলা ষড়যন্ত্র বিরোধী সংগ্রাম ইত্যাদি পেরিয়ে ধর্ম-বর্ণ, শ্রেনী-পেশা নির্বিশেষে তারা আবাল বৃদ্ধবনিতা যেখানে এসে দাঁড়ালো তার নাম গণ অভূস্থান আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী একসময়ের খোকা-মুজিব, মুজিব ভাই, শেখ মুজিব ইত্যাদি থেকে “বঙ্গবন্ধু” অভিধায় অভিসিক্ত হলেন।

একাত্তরের ৭ই মার্চ তদনিত্তন রেসকোস ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়াদি উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের অলিখিত বক্তব্যে লক্ষ লক্ষ জনতার অবিরাম জয় ধ্বনি আর স্লোগানের মাঝে উপস্থাপন করলেন বাঙালি জাতির অনন্য সাধারন মুক্তি মন্ত্র। নিযাতন, নিপীড়ন আর অত্যাচারের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত আর সমাজতন্ত্র-গণতন্ত্র-ধর্ম নিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের অনির্বায শুভপরিনতিক ইঙ্গিত শেষে নিভিক কন্ঠে উচ্চারন করলেন –“এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ”। জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব প্রামান্য ঐতিহ্যের এই মুক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে গোটা বাঙ্গালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ল। এক মাস না গড়তেই ২৬শে মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনাপএে স্বাক্ষর দান করলেন। ওদিকে নরযাদক পাক হানাদার বাহিনী পৈশাচিক নৃশংসতা নিয়ে যে গনহত্যা শুরু করেছিল তা আরো তীব্রতা নিয়ে ছড়িয়ে পড়লো সারা দেশে। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতার আসনে হলেন সমাসীফ আর তিনলক্ষ মা বোনের ত্রিশলক্ষ বীর শহীদ (মুক্তিযোদ্ধা), শত সহস্ত্র বুদ্ধিজীবির আত্নহতি সম্ভ্রমাহতির মাঝ দিয়ে এলো ১৬ই ডিসেম্বর। পাক হানাদার বাহিনীর পক্ষে জেনারেল নিয়াজী, মুক্তিবাহিনীর পক্ষে এম.এ.জি ওসমানী এবং মিত্রবাহিনীর পক্ষে জেনারেল অররার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হলো আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত নৃশংস একটি পরাজিত হানাদার পাক শত্রু বাহিনীর  আত্মসর্মপন। সূচিত হলো মহান বিজয় দিবস।

বিশ্বের ইতিহাসে এক কলংকজনক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। লাল সবুজের পতকা হলো উড্ডিন। স্বাধীনতা ঘোষনাপত্র স্বাক্ষরের দিনটিই স্বাধীন সর্বভৌম বাংলাদেশের স্বধীনতা দিবস হিসেবে বিশ্বের ইতিহাসে হল চিহ্নিত। পাক-কারা-রুদ্ধ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান হলেন কারামুক্ত। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ এক দিনের মুকুট বিহীন সম্রাট বিজয় মুকুট পরিধান করে ঢাকা বিমানবন্দরে অশ্রু সজল নয়নে এসে উপনীত হলেন। এক সাগর বেদনাশ্রু এক সমুদ্রে আনন্দোদ্বেলতা আর একরাশ শ্রদ্ধা ভালবাসা নিয়ে অপেক্ষারত উত্তাল জন সমুদ্রে অবগাহন করলেন ফিদেল কাস্ট্রো বর্ণিত হিমালয় সদৃশ এক মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান।

যাত্রা শুরু হলো স্বাধীন বাংলাদেশের। যে বিশ্বাস ঘাতকতা মীরজাফর থেকে শুরু স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির অগোচরে তা দিনে দিনে শাখা পল্লব বিস্তার করে ধিরে ধিরে মহিরুহে রুপান্তরিত হতে থাকলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত্র বাংলাদেশে পোড়ামাটি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। শূন্যহাতে বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার কাজে আত্নোৎসর্গ করলেন। কোথায় খাদ্যদ্রব্য, কোথায় শিতবস্ত্র, কোথায় অর্থ- এ সব অর্জনে তিনি যখন সফলতার মুখ দেখলেন তথনই শুরু হলো  বিড়স্বনা। “চোরে না শোনে ধর্মেও কাহিনী”। অত্মসমালোচনায় দ্বিধাহীন বঙ্গবন্ধু আত্ম বিশ্লেষন করতেও পিছুপা হলেন না। তিনি অকুষ্ট চিত্তে বলতে লাগলেন- “ আমি বিদেশ থেকে যে সাহায্য আনি, চাটার দল তা চেটে নেয়,।. ………… ভিক্ষা করে জনসংখ্যানুযায়ী কম্বল আনলাম, আমারটা কোথায়? ……… দেশ স্বাধীন করে মানুষ পায় সোনার খনি, কয়লার খনি আর আমি পাই চোরের খনি।” স্বাভাবিতভাবেই স্বার্থন্বোষীর আঁত্রে ঘা লাগলো, বুঝতে আর বাকি থাকলো না যে তাদের মুখোশ খুলতে শুরু করেছে। জল ঘোলা হতে লাগলো।

স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির ক্রীড়নক মোস্তাক সং সুযোগের সন্ধানে এগিয়ে যেতে লাগলো। সুযোগ বুঝে কিছু বিপদগামী সেনা সদস্য কতিপয় মীরজাফরের নেতৃত্বে ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট রাতের শেষ প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানকে অনেকটা সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে স্বাধীন দেশকে পরাধিনতার অন্ধকারে করার প্রচেষ্টায় উম্মত্ত হয়ে পড়লো। খুনিরা পুনবাসিত হলো, ইনডেমনিটি বিল পাস করে আলবদর, রাজাকার, আল-শাম্স সহ স্বাধীনতা হননে উদ্যত সকল খল নায়কের চলমান বিচার কার্য নস্যাৎ করে দেয়া হল। এ স্লোগানও কানে এলো “আমারা সবাই তালেবান বাংলা হবে আফগান” পলাশীর আম্র কাননের মত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সদ্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতার সূর্য যেন সমাপ্তি প্রায় হয়ে উঠলো।

নানা সময় নানা দূর্যোগ, নানা চড়াই উৎড়াইয়ের মধ্যদিয়ে এগোতে লাগলো দেশ। উৎপক্তি হলো জঙ্গীবাদ, শুরু হলো মৌলবাদী তৎপরতা। ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন হলো গোটা দেশ। সংখ্যাধিক স্বাধীনতাকর্মী বাঙালির আশা আকাঙ্খা নীরবে নিভৃতে হল ক্রন্দনরত। এক সাগর রক্ত আর রক্তক্ষরণের মাঝ দিয়ে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কুতির যে জয়যাত্রা ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর সূচিত হল, কিছু দিন যেতে না যেতেই তার গতি মন্থর থেকে মন্থরতর, মন্থরতর থেকে মন্থরতম হয়ে এলো।

আবারো অনেক নিগ্রহ অনেক আত্মহুতি অনেক অগ্নিস্নার অতিক্রম করে অবশেষে একবিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে এস মেঘাচ্ছন্ন আকাশে মেঘ ফাঁড়ি দিয়ে দেখা দিল সূর্যোজ্বলতা। পট পরিবর্তন হলো। ক্ষমতায়নে এলো স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি। ষড়যন্ত্র পারদর্শী বাঙালীর ষড়যন্ত্র থেমে থাকলো না। সমান্তরাল গতিতে এগিয়ে চললো নানামুখী উন্নয়নমূলক কাজ আর উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ করার ষড়যন্ত্র। রেল চলাচলে বিঘ্ন, বাস চলাচলে বাধা, পেট্রল বোমা নিক্ষেপ, অগ্নি সন্ত্রাস, বুদ্ধিজীবী নিধন, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা, বলতে গেলে একদিকে জাতিকে পশ্চাৎপদ করার যাবতীয় কলাকৌশলের দৌড়াত্য আর একদিকে উন্নয়নমূলক অগ্রগতির জয়যাত্রার প্রতিযোগিতা মাথায় নিয়েই জাতির পিতার সুযোগ্য তনয় দক্ষ নারী নেতৃত্বেও অগ্রদূত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে চললো গনপ্রজাতণ্রী বাংলাদেশ সরকার। সকল পরিকল্পানায় সৃষ্টি হলো প্রতিবন্ধকতা।

যে ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ অনেকটাই সফলকাম সেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রাথমিক স্বপ্ন তুচ্ছ তাচ্ছিল্যে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা যত্রতত্র দানাবেঁধে উঠলো। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাইলফলক দক্ষিণ পূর্ববঙ্গেঁর বানিজ্যিক সেতুবন্ধ “পদ্মা সেতু” নির্মানের সূচনা লগ্নেই বিশ্ব ব্যাংক অঙ্গিকার বদ্ধ অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করল। দেশীয় অর্থায়নে সেই বিশাল কর্মযঞ্জ যখন সমাপ্ত প্রায় পদ্ম সেতু যখন পুরোপুরি দৃশ্যমান তখন তার শুভ বুদ্ধির উদয় হল, ইঙ্গিত এলো সেই প্রত্যাখ্যাত সহযোগিতার হাত পূণপ্রসারণের। অসমুলীয় সরকারের নৈমানিক অগ্রগতি আজও অব্যাহত। হইত আগামী বছর তার কার্যকারিতাও হবে দৃশ্যমান। পারমানবিক বিদ্যৎ কেন্দ্রের পরিকল্পা থেকে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে আজও তা থেমে নেই, তবু বিশেষ কওে রুপপুর পারমানবিক বিদ্যৎ কেন্দ্রের সম্ভবত প্রায় ৮০ ভাগ কর্মকান্ডই সমাপ্ত। মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হয়েছে। কর্ণফুলি ট্যানেলের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এগিয়ে চলেছে এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ের কাজও আজ মানুষ একই ট্রেনে বসে যাচ্ছে ঢাকা থেকে পঞ্চগড়, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা। এভাবে চললে সে দিন হয়তো দুরে নেই যে দিন মানুষ একই ট্রেনে বসে যাবে তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে শুধু মর্ত বিজয়ই নয় আকাশ বিজয়েও জাতি ঈর্ষণীয় গৌরবের দাবীদার।

ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সফলতার সঙ্গেঁ আকাশ বিজয়ে সক্ষম হয়েছে। পাতাল রেল পরিকল্পনার কাজও অগ্রসরমান। আপাতত শেষ বিজয় সূচিত হল বিজয়ের মাসের ২২ তারিখ, বুধবার। অনুর্ধ-১৯ নারী ক্রিকেট সাফ চাম্পিয়ান প্রতিযোগিতায় স্বানামধন্য ভারতীয় অনুর্ধ-১৯ নারী ক্রিকেট দলকে হারিয়ে বাংলাদেশ শিরোপা অর্জন করেছে। আজ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়, জিডিপি সবই উন্নয়নের অনন্য সূচকে স্বীকৃত। বিশ্ব দরবারে দেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে নন্দিত। সার্বিক ঈর্ষনীয় উন্নয়নের এই ডামাডোলেও নৈতিকতার নেতিবাচকতা যে নেই সে কথা অবলীলাক্রমে বলঅ কঠিন। এই ক্ষেত্রটিকে সুজলা সুফলা করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার গঠনমূলক চিন্তা চেতনায়। ধর্ষণ, খুন, রাহাজানি, যান দূর্ঘটনা-এ সবেরই নিমূল অভিযান ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে, হচ্ছে, হবে। যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে আপন পর নির্বিশেষে তার সঠিক চলমানতা সক্রিয় থাকলে সফলতা আসবেই। সব মিলিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে এবং জাতির পিতার জন্ম শত বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে এ কথা অকুন্ঠ চিত্তে বলা যায় যে, এবারের বিজয় দিবস এক অনন্য মাত্রায়, এক অনন্য সূচকে সমাসীন।

লিখা: উদয় নাথ লাহিড়ী, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও কলামিস্ট

তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

More News Of This Category