1. [email protected] : Abdul Ahad Masuk : Abdul Ahad Masuk
  2. [email protected] : ABU NASER : ABU NASER
  3. [email protected] : Hafijur Rahman Suyeb : Hafijur Rahman Suyeb
  4. [email protected] : Lily Sultana : Lily Sultana
  5. [email protected] : MahfuzurRahman :
  6. [email protected] : MUHIN SHIPON : MUHIN SHIPON
  7. [email protected] : Sinbad :
  8. [email protected] : SIFUL ISLAM : SIFUL ISLAM
  9. [email protected] : Muhammad Yousuf : Muhammad Yousuf

গাজী আজমল স্যারের স্মৃতির পাতা থেকে

  • Update Time : Friday, July 3, 2020

” আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যায় এম.এসসি. করি। ১৯৭১ এর পহেলা মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে পরদিন পতাকা উত্তোলন করা হবে। ২রা মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে বটতলায় লাখ লাখ ছাত্রজনতার উপস্থিতিতে পতাকা উত্তোলন করেন আ.স.ম. আবদুর রব সাহেব। একটা আবেগপ্রবণ মুহূর্ত ছিল সেটা। সবাই নিস্তব্ধ হয়ে ছিল। আমি ভীড় ঠেলে মঞ্চের কাছে গিয়ে রব সাহেবকে ধাক্কা দিলাম, এরপর তিনি পতাকা উত্তোলন করলেন। তখন আমার মনে হয়েছিল যেন আমার হাতেই পতাকাটি উঠলো। বাঙালি জাতির ইতিহাসে আমার স্পর্শ রয়ে গেলো। এটা আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা।

তারপর আসলো ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। তোমরা এখন রেসকোর্স ময়দানে যে জনসমুদ্রের চিত্র দেখো সেখানে তৃতীয় বা চতুর্থ সারিতে আমার পাঁচ ছয়জন বন্ধুর সাথে বাঁশের লাঠিহাতে আমিও ছিলাম। বর্তমানে যেটা নয়াপল্টন, সেখান থেকে পাইকারি দামে আমরা বিভাগের সহপাঠীরা প্রায় দেড়শ বাঁশ কিনেছিলাম। আমাদের কোনো পিছুটান ছিল না। মরলে মরবো !

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে খাবারের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। আমাদের পচা গমের রুটি খেতে হতো। একদিন আমরা অনশনের সিদ্ধান্ত নিলাম এবং কোনোভাবে সেটা মুজিব সাহেবের কানে গেলো। একদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমাদের হলে এসে সেই অবস্থা দেখে গিয়েছিলেন। আমাদের একজন উর্দুতে তাঁর সাথে কথা বলাতে তিনি বললেন, ‘কীরে, এতো কষ্ট কইরা দেশ স্বাধীন করলি, এখন উর্দুতে কথা বলিস ক্যান?’ সেই ছেলেটা তখন উত্তর দিল, ‘আমরা পচা গম খাইতে খাইতে বিহারী হয়ে গেছি।’ তারপর বঙ্গবন্ধু আমাদের ভালো খাবারের আশ্বাস দিলেন। এরপর আমি কি জানি একটা বললাম, ঠিক মনে পড়ছে না, শেখ মুজিব আমাকে কাছে ডেকে জড়িয়ে ধরলেন। এই অসাধারণ অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়!

আমার বাবা সরকারী পুলিশ ওসি। ছয় ভাইয়ের মধ্যে আমি সবার বড়। আমাকে নটরডেম কলেজে পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য বাবার ছিল না। তাই জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে বি.এস.সি. করি জীববিজ্ঞান ও রসায়নের উপর। বি.এস.সি. ফাইনালে ডিস্টিংশনসহ ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হই। দ্য ডেইলি অবজারভার পত্রিকায় আমাদের কয়েকজনের নাম ছাপা হয়েছিল। সেদিন আমার তৃতীয় ছোট ভাই গাজী আসমত খুশিতে আমাকে শূন্যে তুলে নিয়েছিল। আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত ছিল সেটা। এরপর প্রাণিবিজ্ঞানে এমএসসি করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

জন্মগতভাবে আমি ফ্ল্যাট-ফুটেড। আমার নানা চাইতেন আমার বাঁকা পা ভালো হোক, কিন্তু অপারেশন দিয়ে নয়। তিনি চায়না থেকে বিশেষ জুতা এনে দিতেন আমার জন্য। এই বাঁকা পা নিয়েই আমি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ইওপিসি (পরবর্তীতে বিএনসিসি) এর চার্জে ছিলাম। প্যারেডে আমি ফার্স্ট হলাম। লেফটেনেন্ট উপাধি পাবার প্রায় দ্বারপ্রান্তে তখন আমি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দ্বারা করা মেডিকেল টেস্টে আমার এই ব্যাপারটা ধরা পড়ল। তখন তিনি বললেন, ‘স্যার দুঃখিত। আপনি ফ্ল্যাট-ফুটেড। কিন্তু আপনি এই পা নিয়েই প্যারেডে কীভাবে ফার্স্ট হলেন সেটাই আশ্চর্য লাগছে।’

আমি নটরডেম কলেজে পার্টটাইম প্রভাষক হিসেবে যোগদান করি ১৯৭৬ সালে। তখন অধ্যক্ষ ছিলেন ফাদার পিশোতো। সেসময় একইসাথে নটরডেম কলেজ, ভিকারুননিসা নূন কলেজ ও আদমজী কলেজে শিক্ষকতা করি। ১৯৮৩ সালে আমি নটরডেমে ফুলটাইম প্রভাষক হিসেবে যোগদান করি। সেসময় একইসাথে ভিকারুননিসা নূন কলেজ ও ফয়জুর রহমান আইডিয়াল ইন্সটিটিউটে অধ্যক্ষের অনুরোধে সেখানেও কয়েক বছর শিক্ষকতা করি। পরবর্তীতে নটরডেম কলেজে জীববিজ্ঞান বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হই। দীর্ঘ ২৭ বছর আমি কলেজের বার্ষিক ম্যাগাজিন ব্লু এন্ড গোল্ডের সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলাম।

সারাদেশ জুড়ে আমার অগণিত ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েও আমি আমার শিক্ষার্থী পেয়েছি। তারা এসে সালাম দিয়ে আমার সাথে কথা বলে। খুব ভালো লাগে তখন।
আমি ২০১০ সালে সেরা শিক্ষক পুরস্কার অর্জন করি। শিক্ষকজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করি ২০১১ সালে। এখন আমার রচিত উচ্চ মাধ্যমিক জীববিজ্ঞান বইটি নিয়েই ব্যস্ত আছি।

পরিশেষে আরেকটি কথা বলতে চাই যে, আমরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমি মোটেও সন্তুষ্ট নই। এমন দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচারে আক্রান্ত দেশ বঙ্গবন্ধু কিংবা মুক্তিযোদ্ধারা কেউই চাই নাই। সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন দেখি কিছু মানুষ যারা যুদ্ধের সময় পালিয়ে ছিল তারা এখন মিথ্যা মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র ব্যবহার করে, বড় বড় কথা বলে! আমি আমার মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র কোথাও ব্যবহার করিনি এবং আমার সন্তানদেরও ব্যবহার করতে দেইনি। কারণ আমি যুদ্ধ করেছিলাম দেশের স্বার্থে, নিজের স্বার্থে নয়!
আশা করি একদিন আমাদের এই সুন্দর বাংলাদেশে কোনো অন্যায় অবিচার থাকবে না! ”

গাজী আজমল
অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক
জীববিজ্ঞান বিভাগ
নটরডেম কলেজ, ঢাকা

তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

More News Of This Category