1. mahfujpanjeree@gmail.com : Mahfuzur-Rahman :
  2. admin@samagrabangla.com : main-admin :

গাজওয়াতুল হিন্দ বা হিন্দের যুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন জরুরি

  • Update Time : শুক্রবার, এপ্রিল ২২, ২০২২

আতাহার হোসাইন: আখেরী যুগে ইসলাম সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হবে এমন ইঙ্গিত কোর’আনেও আছে, হাদীসেও আছে। হাদীসে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর মধ্যে গাজওয়ায়ে হিন্দ বা হিন্দের যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও চিত্তাকর্ষক বিষয়। ভারত উপমহাদেশে ইসলামের উত্থানকামী প্রতিটি আন্দোলনই এই যুদ্ধের মহিমা সম্পর্কে সচেতন। আল্লাহর রসুল গাজওয়ায়ে হিন্দের শহীদদেরকে বদর যুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং তাঁর প্রিয় সাহাবি আবু হোরায়রা আকুল আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এই যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য। “গাজওয়াতুল হিন্দ” সম্পর্কে ৫টি হাদিস এখানে উল্লেখ করছি।

(১) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘আল্লাহর রসুল (সা.) আমাদের থেকে গাজওয়াতুল হিন্দ (হিন্দুস্তানের যুদ্ধ) করার প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। কাজেই আমি যদি সেই যুদ্ধের নাগাল পেয়ে যাই, তাহলে আমি তাতে আমার জীবন ও সমস্ত সম্পদ ব্যয় করে ফেলব। যদি নিহত হই, তাহলে আমি শ্রেষ্ঠ শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হব। আর যদি ফিরে আসি, তাহলে আমি জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত আবু হুরায়রা হয়ে যাব”। (সুনানে নাসায়ী, খ- ৬, পৃষ্ঠা ৪২)

(২) সাওবান (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের দুটি দল এমন আছে, আল্লাহ যাদেরকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ করে দিয়েছেন। একটি হল তারা, যারা গাজওয়াতুল হিন্দ (হিন্দুস্তানের যুদ্ধ) করবে, আরেক দল তারা যারা ঈসা ইবনে মারিয়ামের সঙ্গী হবে। (সুনানে নাসায়ী, খ- ৬, পৃষ্ঠা ৪২)

(৩) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ (সা.) হিন্দুস্তানের কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, অবশ্যই আমাদের একটি দল গাজওয়াতুল হিন্দ (হিন্দুস্তানের যুদ্ধ) করবে, আল্লাহ সেই দলের যোদ্ধাদের সফলতা দান করবেন, আর তারা রাজাদের শিকল/বেড়ি দিয়ে টেনে আনবে। এবং আল্লাহ সেই যোদ্ধাদের গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন। এবং সে মুসলিমেরা ফিরে আসবে তারা ঈসা ইবনে মারিয়াম (আ.) কে শাম দেশে (বর্তমান সিরিয়ায়) পাবে”।

(৪) আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, “আমি যদি সেই গাযওয়া পেতাম, তাহলে আমার সকল নতুন ও পুরাতন সামগ্রী বিক্রি করে দিতাম এবং এতে অংশগ্রহণ করতাম । যখন আল্লাহ আমাদের সফলতা দান করতেন এবং আমরা ফিরতাম, তখন আমি একজন মুক্ত আবু হুরায়রা হতাম; যে কিনা সিরিয়ায় হযরত ঈসা (আ.) কে পাবার গর্ব নিয়ে ফিরত। ও মুহাম্মাদ (সা.)! সেটা আমার গভীর ইচ্ছা যে আমি ঈসা (আ.) এর এত নিকটবর্তী হতে পারতাম, আমি তাকে বলতে পারতাম যে আমি মুহাম্মাদ (সা.) এর একজন সাহাবী”। বর্ণনাকারী বলেন যে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ ‘খুব কঠিন, খুব কঠিন’। (আল ফিতান, খ- ১, পৃষ্ঠা ৪০৯)

(৪) কা’ব (রা.) বর্ণিত, রসুলাল্লাহ (সা.) বলেন: “জেরুসালেমের [বর্তমান ফিলিস্তিন] একজন রাজা তার একটি সৈন্যদল হিন্দুস্তানের দিকে পাঠাবেন, যোদ্ধারা হিন্দের ভূমি ধ্বংস করে দিবে, এর অর্থ-ভা-ার ভোগদখল করবে, তারপর রাজা এসব ধনদৌলত দিয়ে জেরুসালেম সজ্জিত করবে, দলটি হিন্দের রাজাদের জেরুসালেমের রাজার দরবারে উপস্থিত করবে, তার সৈন্যসামন্ত তার নির্দেশে পূর্ব থেকে পাশ্চাত্য পর্যন্ত সকল এলাকা বিজয় করবে, এবং হিন্দুস্তানে ততক্ষণ অবস্থান করবে যতক্ষণ না দাজ্জালের ঘটনাটি ঘটে”। (ইমাম বুখারী (র.) এর উস্তাদ নাঈম বিন হাম্মাদ (র.) এই হাদিসটি বর্ণনা করেন তার ‘আল ফিতান’ গ্রন্থে। এতে, সেই উদ্ধৃতিকারীর নাম উল্লেখ নাই যে কা’ব (রা.) থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছে)

(৫) সাফওয়ান বিন উমরু (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, “আমার উম্মাহর একদল লোক হিন্দুস্তানের সাথে যুদ্ধ করবে, আল্লাহ তাদের সফলতা দান করবেন, এমনকি তারা হিন্দুস্তানের রাজাদেরকে শিকলবদ্ধ অবস্থায় পাবে। আল্লাহ সেই যোদ্ধাদের ক্ষমা করে দিবেন। যখন তারা সিরিয়া ফিরে যাবে, তখন তারা ঈসা ইবনে মারিয়ামকে (আ.) এর সাক্ষাত লাভ করবে”। (আল ফিতান, খ- ১, পৃষ্ঠা ৪১০)

এখানে রাসুল (সা.) এর বর্ণিত তৎকালীন হিন্দুস্তানের সীমারেখা বর্তমান ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
যুদ্ধটিকে আমাদের আলেম ওলামারা তাদের বইপত্রে, ওয়াজে হিন্দু বনাম মুসলিমের যুদ্ধ হিসাবে বর্ণনা করে থাকেন। হিন্দুদের বিরুদ্ধে আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা উচ্ছেদ অভিযান হয়ে থাকে সেখানেও এই গাজওয়াতুল হিন্দের ধারণা দিয়ে উজ্জীবিত করা হয়। কিন্তু আসলে গাজওয়াতুল হিন্দ মানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এমন ধারণা মোটেও ঠিক নয়। আল কায়েদা নেতা আছেম ওমর তার “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ: মাহদি ও দাজ্জাল” বইটিতে গাজওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী লিখেছেন, “হিন্দুস্তানের রণাঙ্গনে মুজাহিদগণ হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত থাকবে। এই রণাঙ্গনটি যারপর নাই ভয়ানক হবে।

শুরুতে মুসলমানদের অনেক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। তারপর মুজাহিদরা হিন্দুদের পরাজিত করে কেবলই সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকবে। এভাবে তারা সমগ্র হিন্দুস্তানে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করে দেবে। তারা হিন্দুদের বড় বড় নেতা ও সেনাপতিদের জীবিত গ্রেফতার করে নিয়ে আসবে। যুদ্ধ সমাপ্ত করে যখন ফিরে আসবে, তখনই সংবাদ পাবে, ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.) এসে পড়েছেন।”

কাশ্মীরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোও হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলেই বিষয়টির বিবরণ দিয়ে থাকে। এই সুপ্রতিষ্ঠিত ধ্যানধারণা থেকেই অনেক জঙ্গিবাদী দলও ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে যেন তারা রসুলাল্লাহর হাদীসকে বাস্তবায়ন করে ফেলতে পারে। এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু ভিন্ন। একটি যুদ্ধের নামকরণ করা হয় সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যেমন বদর, ওহুদ, তাবুক, হুনায়ন ইত্যাদি সবই যুদ্ধক্ষেত্রের নাম। একইভাবে হিন্দের যুদ্ধ একটি যুদ্ধক্ষেত্রের নাম।

হিন্দ বলতে বোঝায় সিন্ধু নদীর অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা যার মধ্যে ভারত পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত। এই হিন্দের অধিবাসীদেরকে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হিন্দু বলা হয়, ধর্মীয় কারণে নয়। কারণ হিন্দু ধর্ম বলতে আদতে কোনো ধর্ম নেই, তাদের ধর্মগ্রন্থে হিন্দু ধর্মের কোনো উল্লেখ নেই। ধর্মটির আসল নাম বৈদিক ধর্ম বা সনাতন ধর্ম। তাই হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হবে এই কথাটি ১৪০০ বছর আগে কোনো অর্থ বহন করত না।

আসলে ইসলামের যুদ্ধগুলো কোনো ধর্মের অনুসারীদের বিরুদ্ধে হয় না, ইসলামে যুদ্ধ হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, অবিচারের বিরুদ্ধে। যদি জন্মগতভাবে মুসলিম দাবিদাররা কার্যক্ষেত্রে অসত্যের ধারক হয় তাহলে ইসলামের যুদ্ধ তাদের বিরুদ্ধেও ততটুকুই বাধ্যতামূলক যতটুকু অন্যদের ক্ষেত্রে।

আমরা মনে করি, আলেম ওলামা বা ইসলামি চিন্তাবিদ যারা আছেন তাদের এ বিষয়টি নিয়ে ভাবার দরকার আছে। কারণ হলো এখন হিন্দু ও মুসলমান নামে যে দুটো বৃহৎ জনগোষ্ঠী আছে তারা কেউই তাদের প্রকৃত ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত নেই, তারা উভয়েই তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে বহুদূরে অবস্থান করছে। এখন তাদের ধর্মপরিচয় প্রায় পুরোপুরি জন্মভিত্তিক। আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসলমানরা আজকাল অন্যায়ের পক্ষ নিয়েছে, তারা মুখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলছে, অর্থাৎ ঘোষণা দিচ্ছে আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই, আর বাস্তবে পাশ্চাত্যের হুকুম-বিধান, আইনকানুন, সংস্কৃতি ও জীবনব্যবস্থা মানছে। হিন্দুরাও একই আইনকানুন, জীবনব্যবস্থা ও সংস্কৃতি মেনে নিয়েছেন। তাহলে এই উভয়শ্রেণির মধ্যে যুদ্ধের কোনো আলাদা তাৎপর্য থাকে কি?

এর বাইরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু লোক আছেন যারা আন্দোলন করে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, আবার হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু লোক হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। সাধারণত উভয় সম্প্রদায়ের এই আন্দোলনমুখী শ্রেণিটি তাদের ধ্যান-ধারণার মধ্যে অপর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ ও বিস্তার করেন। এরাই বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতন ও হত্যাকা- ঘটায়, আবার ভারতে ঐ হিন্দুত্ববাদীরা যে কোনো ইস্যু পেলেই মুসলিম নিধনে মেতে ওঠে।

তারা উভয়পক্ষই সোশ্যাল মিডিয়ায় পারস্পরিক গালাগালি চালিয়ে যাচ্ছে। গাজওয়াতুল হিন্দের প্রসঙ্গটি নিয়ে যেভাবে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ইংরেজি, বাংলা, হিন্দী, ঊর্দূ, আরবি ভাষায় পরিচালিত শত শত পেইজ, প্রোফাইল বা গ্রুপ থেকে বা ওয়াজ-নসিহতে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে, তাতে করে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আরও পোক্ত হয়। কিন্তু আমরা মনে করি গাজওয়াতুল হিন্দকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বিষয়টি আসলে তেমন নয়।

এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ও শহীদদের এত মর্তবা, সম্মান হওয়ার একটাই কারণ এখানে সত্য ও মিথ্যার সংঘর্ষ হবে, সত্যের প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যার বিনাশ ঘটবে। এই যুদ্ধে যারা সত্যের পক্ষ নিবে তারাই আল্লাহর সাহায্য পাবে, আর যারা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তারা ধ্বংস হবে, তাদের ধর্মবিশ্বাস ইসলাম হোক বা যা-ই হোক না কেন।

নবী করিম (সা.) এই সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ের কথা বলেছেন, হিন্দু-মুসলিম লেবাসধারীদের মারামারি বোঝাননি। আলেম-ওলামাদের তাই এ ব্যাপারে অবশ্যই চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

[মতামতের জন্য যোগাযোগ: ০১৬৭০১৭৪৬৪৩, ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৯৩৩-৭৬৭৭২৫, ০১৭৮২-১৮৮২৩৭]

তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

More News Of This Category