1. mahfujpanjeree@gmail.com : Mahfuzur-Rahman :
  2. admin@samagrabangla.com : main-admin :
  3. mahmudursir@gmail.com : samagra :

একুশে ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত আন্দোলন

  • Update Time : শনিবার, জুন ২৪, ২০২৩

ভাষা আন্দোলন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ (Language Movement and Development of Bengali Nationalism) একুশে ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত আন্দোলন:

খাজা নাজিমুদ্দীন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকা সফরে আসেন। ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানের জনসভায় তিনিও জিন্নাহর মতো ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ এর প্রতিবাদে ভাষা আন্দোলন নতুন করে শুরু হয়ে যায়। এবার প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ছাত্র জনতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৩০ জানুয়ারি সভা ও ছাত্র ধর্মঘট আহŸান করে। সংগ্রাম পরিষদ ৪ ফেব্রæয়ারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট

আহŸান করে। ৩১ জানুয়ারি আওয়ামী মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সর্বদলীয় সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। কাজী গোলাম মাহবুবকে আহŸায়ক করে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এই সভায় ২১ ফেব্রæয়ারি পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশনের দিন দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সরকার এ আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করার কৌশল গ্রহণ করে। পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন আন্দোলন দমন করার জন্য ২০ তারিখ থেকে পরবর্তী এক মাসের জন্য ঢাকা জেলার সর্বত্র ১৪৪ ধারা জারি করেন। এর মাধ্যমে ঢাকায় যে কোন প্রকার সভা, সমাবেশ, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ছাত্ররা সরকারি এই সিদ্ধান্ত কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে সভা করে তারা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২০ ফেব্রæয়ারি সন্ধ্যায় আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক বসে। এই বৈঠকে আবদুল মতিন, অলি আহাদ, গোলাম মাহবুব প্রমুখ নেতা ১৪৪ ধারা অমান্য করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে জোরলো মত দেন। অবশেষে সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ২১ ফেব্রæয়ারি সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের চত্বর) ছাত্রদের সভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী সমাবেশে যোগ দেয়। সভায় ছোট ছোট দলে ছাত্ররা মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়। ছাত্র-ছাত্রীরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে মিছিল করতে থাকলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠি চার্জ করে এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। ফলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। বিকেলে ব্যবস্থাপক পরিষদের সভার দিকে প্রতিবাদ মিছিল অগ্রসর হতে গেলে পুলিশ গুলি ছুঁড়ে। পুলিশের গুলিতে শহিদ হন আবুল বরকত, আবদুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার এবং আহত হন কয়েকজন ছাত্রীসহ অনেকে। সে সময়ে গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল। গুলির খবর পেয়ে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশসহ আইন পরিষদের কয়েকজন সদস্য অধিবেশন ত্যাগ করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যার খবর শহরে দ্রæতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। শহরের চারদিক থেকে জনতার স্রোত এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে মিলিত হয়। জনতা শহিদদের জন্য শোক মিছিল বের করে। আবারও মিছিলের ওপর পুলিশ ও মিলিটারি লাঠি, গুলি ও বেয়োনেট চার্জ করে। এতে শফিউর রহমানসহ আরও কয়েকজন শহিদ হন। অনেকে গ্রেফতার  হন। যে স্থানে ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সেই মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্ররা ২২ ফেব্রæয়ারি সারারাত জেগে একটি শহিদ মিনার নির্মাণ করে। ২৩ ফেব্রæয়ারি শহিদ শফিউরের পিতাকে দিয়ে শহিদ মিনারটি উদ্বোধন করা হয়। ২৪ ফেব্রæয়ারি পুলিশ শহিদ মিনারটি ভেঙ্গে দেয়।

২১ ফেব্রæয়ারির হত্যাকাÐ ও নিপীড়নের প্রতিবাদে ঢাকা শহরে ২৩ ফেব্রæয়ারি হরতাল পালিত হয়। ২৩ ফেব্রæয়ারি পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফুলার রোডে একজন কিশোর নিহত হয়। ২৪ ফেব্রæয়ারি ঢাকায় হরতাল পালিত হয়। ডা. সাঈদ হায়দারের নকশা অনুসারে রাতে মেডিকেল কলেজের গেইটের সামনে শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয় এবং ২৪ ফেব্রæয়ারি তা উদ্বোধন করা হয়। ১৯৬৩ সালে অস্থায়ী শহিদ মিনারের স্থলে শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশা ও পরিকল্পনায় শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহিদ মিনারটি ভেঙ্গে দেয়। ১৯৭২ সালে পূর্বের নকশা অনুযায়ী বর্তমান শহিদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়। 

বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে ভাষা আন্দোলন:

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে এটি ছিল বাঙালি জাতির প্রথম বিদ্রোহ। ভাষা আন্দোলন তৎকালীন রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। ২১ শে ফেব্রæয়ারি মিছিলে গুলি করে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ এবং তরুণ কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘স্মৃতির মিনার’ শীর্ষক কবিতা রচনা করেন। হাসান হাফিজুর রহমানের ‘একুশের সংকলন’ ভাষা

আন্দোলন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রæয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’, সঙ্গীতশিল্পী আবদুল লতিফে রচনা ও সুরে ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ এবং বাগেরহাটের চারণ কবি শামসুদ্দিন আহমেদ রচনা করেন ‘তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’ শীর্ষক গান। ড. মুনীর চৌধুরী জেলে বসে রচনা করেন ‘কবর’ নাটক এবং জহির রায়হান রচনা করেন ‘আরেক ফাল্গুন’ শীর্ষক উপন্যাস। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত এসব কবিতা, গান, নাটক ও উপন্যাস বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরের বছর থেকে প্রতিবছর ২১ ফেব্রæয়ারি দিনটি বাঙালির শহিদ দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২১ ফেব্রæয়ারি সরকারি ছুটির দিন ঘোষিত হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিম্নে আলোচনা করা হলো।

প্রথমত: ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগঠিত গণ আন্দোলন। এটি শুধু ভাষার মর্যাদার জন্যই গড়ে ওঠেনি। ভাষা আন্দোলনের ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায় হিসেবে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠাকে বাঙালিরা বেছে নেয়। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাই ষাটের দশকে স্বৈরশাসন বিরোধী ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে আন্দোলনে প্রেরণা জোগায়।

দ্বিতীয়ত: ভাষা আন্দোলনের ফলে অসা¤প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ ঘটে। এই আন্দোলন দ্বিজাতি তত্তে¡র ধর্মীয় চেতনার মূলে আঘাত হানে। পাকিস্তান সৃষ্টির সা¤প্রদায়িক ভিত্তি ভেঙ্গে বাঙালিরা অসা¤প্রদায়িক চেতনার আন্দোলন শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি গড়ে ওঠে।

তৃতীয়ত: ভাষা আন্দোলনে মুসলিম লীগ জনগণের মানসিকতা ও স্বার্থ উপেক্ষা করে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে দলটির শোচনীয়ভাবে পরাজয় ঘটে। এর পর আর কোন নির্বাচনে মুসলিম লীগ জয়ী হয়নি।

চতুর্থত: ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি মোতাবেক ২১ ফেব্রæয়ারি শোক দিবস হিসেবে ছুটি ও শহিদ দিবস ঘোষণা করে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। ১৯৬২ সালে সংবিধানে তা বহাল থাকে।

পঞ্চমত: যুক্তফ্রন্ট পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য তুলে ধরে, যা ষাটের দশকে আওয়ামী লীগের ছয় দফায় পরিস্ফুটিত হয়। স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয় যার প্রেরণা ছিল ভাষা আন্দোলন।

ষষ্ঠত: ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ ফেব্রæয়ারিকে ‘আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর স্বীকৃতি দান আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। 

ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয়তাবাদ বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাষা আন্দোলন সকলকে ঐক্যবদ্ধ

করে। পাকিস্তানের প্রতি মানুষের মনে যে মোহ ছিল তা ধীরে ধীরে কেটে যায়। বাঙালি হিসেবে নিজেদের আত্মপরিচয়ের জন্য রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্দি করে। ভাষা কেন্দ্রীক এই ঐক্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি রচনা করে। এটিই পরবর্তীকালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মূলকথা: ভাষা আন্দোলন বাঙালির জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। মাতৃভাষাকে আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ সময় পূর্ববাংলার ছাত্র সমাজ জীবন বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হতেই শাসকদের কাছ থেকে পূর্ব বাংলার জনগণ কোন সহানুভূতি পায়নি। তাই তাদেরকে প্রতিবাদ করতে হয়েছে। তারা হয়েছে সংঘবদ্ধ। শেষ পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। মায়ের ভাষাকে রক্ষা করেছে বুকের রক্ত দিয়ে। এই ঘটনা পূর্ববাংলার জনগণের মনের শক্তিকে অনেক বাড়িয়ে

দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অধিকার আদায়ের সব আন্দোলনে একুশের চেতনা সরাসরি ভূমিকা রেখেছে।

তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

More News Of This Category